Ticker

6/recent/ticker-posts

Header Ads Widget

কাঁটাতারের বেড়া তাদের আলাদা করতে পারেনি

আওয়ামী সরকারের পতনের পর থেকেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে বেশ দূরত্ব দেখা দিয়েছে। আর ইস্কন নেতা চিন্ময় প্রভুর গ্রেপ্তার ও আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফের মৃত্যুতে সেই দূরত্ব আরও বেড়েছে। তবে রাজনীতির এমন অস্থিতিশীল অবস্থাতেও মিলেমিশেই থাকছেন বাংলাদেশ-ভারতের দুই সীমান্তবর্তী গ্রাম।   মাইলের পর মাইল কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলার খলিশাকোঠাল ও ভারতের কোচবিহার জেলা সাহেবগঞ্জ থানার বসকোঠাল গ্রামের মধ্যে নেই কোনো রেষারেষি। যেখানে সীমান্ত পেরিয়ে পাশের দেশে যেতে লাগে পাসপোর্ট-ভিসার মতো আনুষ্ঠানিকতা, সেখানে পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই আসা-যাওয়া করেন এই দুই গ্রামের মানুষ। বাংলাদেশের সীমানায় ভারতীয়দের ও ভারতীয় সীমানায় বাংলাদেশিদের দেখা মেলে অহরহই। তারা এই সীমান্তের জমিতে কাজ করার জন্য প্রতিটি দিন ‘সীমানা অতিক্রম’ করেন এবং প্রতিটি দিন একে অপরের বাড়িতে যাওয়ার আসাসহ খাবারও আদান-প্রদান করে থাকেন। তাদের জন্য ‘সীমানা অতিক্রম’শব্দটি সম্ভবত ঠিক প্রযোজ্য না। কারণ, কৃষিকাজসহ নিত্য প্রয়োজনীয় কাজের জন্য তারা শুধুমাত্র যাওয়া-আসা করেন। শুধুই ফুলবাড়ী উপজেলার খলিশাকোঠালসহ উপজেলা জুড়ে ৩৬ কিলোমিটার সীমান্তে নয়, জেলার বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে দুই দেশের নাগরিকদের মাঝে সম্প্রীতির বন্ধন।
খলিশা কোঠাল সীমান্তের বাসিন্দা আবুল কাসেম (৬০)। তার বাবারা দুই ভাই। আবুল কাসেমের বাবা এন্তাজ আলী। আর এন্তাজের ভাই মনছুর আলী। আপন দুই ভাইয়ের বাড়ির দূরত্ব মাত্র ১০ থেকে ১৫ গজ। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর যখন বাংলাদেশ-ভারত ভাগ হয়, তখন থেকেই দুই ভাই দুই দেশের নাগরিক। এন্তাজ আলী বাংলাদেশের নাগরিক ও মনছুর আলী ভারতের। দুই ভাই দুই দেশের নাগরিক হলেও তাদের মধ্যে সম্পর্কের ব্যবধান ও বাংলাদেশ-ভারতে যাওয়া আসাতে কোনো দিনও বাঁধা পড়েনি। এন্তাজ আলী ও মনছুর আলী মারা যাওয়ার পর তাদের ছেলে-মেয়েসহ আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীদের মাঝেও সেই সম্পর্কের ব্যবধান এখনো কমেনি। পাশাপাশি দুই দেশের নাগরিকদের ভালো সম্পর্কে কারণে কিছু বাংলাদেশি নাগরিক ভারতীয় নাগরিকদের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করে আসছেন। তবে দুই দেশের নাগরিকদের মধ্যে যে সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি হয়েছে। সেটি সীমান্তের জিরোলাইনে থেকে ১৫০ গজ ও সর্বোচ্চ ৩০০ গজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। খলিশা কোঠাল সীমান্তে বসবাসরত বাংলাদেশি বাসিন্দা আবুল কাসেম (৬০) জানান, দেখেন আমার বাড়ি থেকে ভারতে আমার জ্যাটাতো ভাইয়ের বাড়ির দূরত্ব মাত্র ১০ থেকে ১৫ গজ। আমরা সব সময় দুই পরিবারের মাঝে প্রতিনিয়ত যাওয়া আসা করি। বাপ-জ্যাঠার আমল থেকে আজ পর্যন্ত কোনো আমাদের দুই পরিবারের সম্পর্কের ব্যবধান কমেনি। দিন রাতে যাওয়া আসা হয়ে থাকে। শুধু আমাদের দুই পরিবারের মাঝে নয়। এখানে আমরা জ্যাঠাতো ভাইয়ের বাড়ির সাথে এক লাইনে প্রায় ২০টি ভারতীয় পরিবারের বসবাস। সাথে লাগা আমাদের বাংলাদেশি পরিবারও প্রায় ২৫টি। তাদের সাথে আমরা অত্যন্ত মিলেমিশে যুগের পর যুগ বসবাস করে আসছি। সেটি দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি-বিএসএফের সদস্যরাও জানেন। প্রায় দিনে বিজিবি ও বিএসএফ সদস্যরা খোঁজ খবর নেন এবং আমাদের বাড়ির কাছেই প্রায় সময় পতাকা বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। তিনি আরও জানান, বাড়ির পূর্ব ও উত্তর দিকে প্রায় দুই কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া নেই। কিন্তু তিন ফিট লম্বা সিঙ্গেল কাঁটাতারের বেড়া থাকায় ২৪ ঘণ্টা ভারতীয় বিএসএফ সদস্যরা টহল দেন। ওই সীমান্তের বাংলাদেশি নাগরিক হযরত আলী জানান, আমার বাড়ি থেকে মাত্র পাঁচ ফুট দূরত্ব প্রতিবেশি ভারতীয় নাগরিকের বাড়ি। আমরা এই সীমান্তে দু’দেশের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি পরিবার বসবাস করছি। আমাদের মধ্যে আজ পর্যন্ত কোনো দ্বন্দ্ব হয়নি। তারাও আমাদের বাড়িসহ আশপাশের বাড়িগুলোতে যাওয়া আসা করে। আমরাও তাদের বাড়িতে যাওয়া-আসা করি। কোনো সমস্যা নেই। এছাড়াও প্রায় দিন বিজিবি ও বিএসএফ সদস্যরা আসেন খোঁজ খবর নিতে। আরেক বাংলাদেশি সিরাজুল ইসলাম জানান, প্রতিবেশী পরিবারগুলো সাথে আমাদের সম্পর্ক খুবই ভালো। এছাড়াও কাঁটাতারের বেড়ার ভিতরে থাকা ভারতীয় নাগরিকরা কিন্তু প্রতিবেশী ভারতীয় নাগরিকদের মতো ইচ্ছা করলেও আসতে পারে না। কাঁটাতারের বেড়া ভিতরে থাকা অনেক নাগরিকদের জমি আছে। তারা নিদিষ্ট সময়ে এসে জমিতে কাজ-কর্ম করেন। কাজ কর্ম করার সময় দেখা গেছে পানি খাওয়াসহ বিভিন্ন জিনিসপত্রের প্রয়োজন পড়ে। তখন তারা আমাদের বাড়িতে এসে পানি ও খাওয়া দাওয়াও করেন। এভাবেই যুগের পর যুগ আমরা মিলেমিশে বসবাস করছি।
প্রতিবেশী ভারতের বসকোঠাল গ্রামের বাসিন্দা এরশাদ আলীকে প্রশ্ন করা হয়, আপনি তো বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন, আপনার বাড়িটি এখান থেকে কতদূর? ওই ভারতীয় নাগরিক এরশাদ আলী বলেন, এখান থেকে ২০ গজ দূরে আমার বাড়ি। আমার বাপ-দাদার আমল থেকে বাংলাদেশের প্রতিবেশীর বাড়িতে যাওয়া-আসা করি। যদিও বাংলাদেশ একটি আলাদা দেশ। কিন্তু এইটুক জায়গায় আসতে পার্সপোট ভিসা লাগে না আমাদের। আমরা এভাবেই সীমান্তে যুগের পর যুগ মিলেমিশে বসবাস করছি। সেটি আমাদের  বিএসএফ ও বাংলাদেশের বিজিবি সদস্যরা জানেন। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীরা আমাদের সব সময় খোঁজ খবর রাখেন। তিনি আরও বলেন, আমার বাড়ি কাঁটাতারের বাইরে আন্তর্জাতিক মেইন পিলার ৯৩৫এর সাব পিলার ২ এর পাশে। হাট-বাজার ও অফিস আদালত এবং অসুস্থ রোগী নিয়ে যাওয়ার সময় বিএসএফের কাছে আধার কার্ড (জাতীয় পরিচয় পত্র) জমা দিয়ে যেতে হয়। সকাল ৬টায় গেলে বিকেল চারটায় ক্যাম্প বন্ধ হয়। তাই এর আগে আমাদের কার্ড সংগ্রহ করতে ফিরে আসতে হয়। ঠিক একইভাবে যে সকল ভারতীয়দের কাঁটাতারের বেড়ার ভেতরে বাড়ি এবং কিছু কিছু জমি কাঁটাতারের বাইরে, তাদেরও আধার কার্ড (জাতীয় পরিচয় পত্র) জমা দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে ফিরে আসতে হয়। আমাদের বাপ-দাদারা যেভাবে সীমান্তের জিরোলাইনে বসবাস করে আসছেন, ঠিক আমরাও একইভাবে বসবাস করে আসছি। আমাদের দুই দেশের নাগরিকদের মাঝে আজ পর্যন্ত কোনো দুই কথা হয়নি। বাকি জীবন যেন এভাবেই কাটাতে পারি। প্রতিবেদকঃ অনিল চন্দ্র রায়

Post a Comment

0 Comments