Ticker

6/recent/ticker-posts

Header Ads Widget

মানুষের ছাগলের ভুঁড়ি পরিষ্কার করে, হাফ কেজি ভুঁড়ি ভাগ্যে জুটছে বাহে!

 



ছামিনা বেগম (৫০) ও স্বামী ভোলা মিয়া (৫৫) থাকেন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের সীমান্তঘেঁষা গোরকমন্ডল আবাসনে। বছরের পর বছর এই দম্পতি এভাবেই কোরবানির ঈদ পালন করে আসছেন।

ঈদের দিন (শনিবার) দুপুর দুইটায় গোরকমন্ডল আবাসনে গিয়ে দেখা যায়, ছামিনা বেগম পলিথিনের ব্যাগে ছাগলের ভুঁড়ি নিয়ে ঘরে ফিরছেন। ঠিক তখন একজন বাসিন্দা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বাহে, এগুলো ছাগলের ভুঁড়ি। পাশের বাড়িতে চারটা খাসির ভুঁড়ি পরিষ্কার করে দিয়েছি, তাই একটার ভুঁড়ি দিয়েছে। গরিব মানুষ, ঈদে কোরবানি দেওয়া তো দূরের কথা—গরু বা খাসির মাংস কিনে খাওয়ারও সামর্থ্য নেই। আপনারা বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, আজ সকালে ডিম ভাজি আর আলুর ভর্তা দিয়ে খেয়েছি। আমি ছাগলের ভুঁড়ি পরিষ্কার করতে গিয়েছিলাম, আর আমার স্বামী গরুর চামড়া ছাড়াতে গিয়েছিলেন। আপনি নিজেই দেখলেন আমি কী নিয়ে ফিরলাম। এখন আমরা সকালের রান্না করা ডিম ও আলুর ভর্তা দিয়ে দুপুরের খাবার খাবো। এভাবেই কেটে যাচ্ছে আমাদের ঈদের দিন।”

ছামিনা বেগমের স্বামী ভোলা মিয়া বলেন, “কি বলবো বাহে! যা দেখছেন সব সত্য। এখানে লুকানোর কিছু নেই। স্ত্রী ছাগলের ভুঁড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরছে, আমি অন্যের গরুর চামড়া ছাড়িয়ে মাংস কেটে দিয়েছি। এখনো কিছু দেয়নি, তবে সন্ধ্যায় হয়তো কিছু মাংস দেবে। আমরা প্রতি বছর এভাবেই ঈদ করি।”

আবাসনের আরেক বাসিন্দা হাসনা বেগম বলেন, “আমার স্বামী গরুর ভুঁড়ি পরিষ্কার করেছে। বিনিময়ে পেয়েছে আধা কেজি ভুঁড়ি। এগুলো এখন ধুয়ে-পরিষ্কার করছি। ঈদে গরুর মাংস না জুটলেও গরুর ভুঁড়ি খেয়েই ঈদ কাটছে বাহে!”

আছমা বেগম (৫৫) বলেন, “ছবি আর ভিডিও করে লাভ কী বাহে? ঈদের দিন সকালে কোনো রকমে ডাল-ভাত খেয়েছি। মাংস কেনার টাকার কথা চিন্তাও করতে পারি না। আয়-রোজগার এমনিতেই কমেছে। বৃষ্টি হলে ঘরের বিছানাপত্রও ভিজে যায়। আমাদের দুঃখ-কষ্ট কেউ দেখে না।”

আব্দুল গফুর ও শাপলা বেগমসহ আরও অনেকেই একই ধরনের কথা বলেন।

আবাসনের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে গোরকমন্ডল আবাসনে ৫২টি পরিবার বসবাস করছে, যার মধ্যে ১০টি পরিবার হিন্দু সম্প্রদায়ের। ঈদে কোরবানি ছাড়াই ৪২টি পরিবার ঈদ উদযাপন করে। সরকার মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিলেও অধিকাংশই নিম্ন আয়ের হওয়ায় পশু কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য তাদের নেই। ফলে প্রতিবছর ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হন এইসব পরিবার।

গোরকমন্ডল আবাসনের সভাপতি আব্দুল মোন্নাফ বলেন, “আমরা যারা এখানে থাকি, তারা সবাই দরিদ্র। আবাসে দুই যুগ পার হয়ে গেল, কেউ কোনো দিন কোরবানি দিতে পারেনি। স্ত্রী-সন্তানকে নতুন কাপড় দেওয়ারও সামর্থ্য নেই। আজকের ঈদের দিনেও কেউ এক টুকরো মাংস খেতে পারেনি। হয়তো রাতে কেউ গরুর ভুঁড়ি, ছাগলের ভুঁড়ি বা বয়লারের দুই টুকরো মাংস পেতে পারে, আবার কেউ নাও পেতে পারে।”

নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাছেন আলী ও স্থানীয় ইউপি সদস্য শ্যামল চন্দ্র মণ্ডল জানান, “আবাসনের প্রত্যেক পরিবারকে সরকার ১০ কেজি করে চাল দিয়েছে ঈদের উপহার হিসেবে। কিন্তু মাংস কেনার সামর্থ্য না থাকায় তাদের ঈদ আনন্দ অপূর্ণই থেকে যায়। সরকার ও সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে অন্তত ঈদের দিনে কিছুটা আনন্দ ভাগ করে নেওয়া সম্ভব হতো।”

প্রতিবেদকঃ অনিল চন্দ্র রায়, ফুলবাড়ী

Post a Comment

0 Comments